সমাজ সংস্কার (প্রথমভাগ)
স্থান: অদ্বৈত জ্ঞানপীঠ আশ্রম
তারিখ: ২২.০১.২০২২, শনিবার
উপনিষদের ক্লাস সবেমাত্র শেষ হয়েছে। বিকেল গড়িয়ে এখন সন্ধ্যা নামছে।
প্রতিদিনের মত আজও মহারাজ ক্লাসের পরে বাইরের ঘরে বসে আছেন, ভক্তদের প্রশ্নের সমাধান করার জন্য। ভক্তগণ আসছেন, নানান প্রশ্ন করছেন, কেউ প্রণাম জানিয়ে বিদায় নিচ্ছেন..
দুজন পৌঢ় ভদ্রলোক, বয়স আন্দাজ ষাটোর্ধ্ব হবে, মালদা থেকে এসেছেন.. বিশেষত, মহারাজের সাথে কথা বলবার জন্য।তাদের মধ্যে একজন সমাজসেবার সাথে গভীরভাবে যুক্ত। তিনিই প্রথম প্রশ্ন শুরু করলেন।
বললেন, মহারাজ আপনাকে দেখে আমার মনে হয়েছে আপনি যেন একাই লড়াই করছেন!
মহারাজ:- দেখুন আমার মনে এমন কোন চিত্র নেই, যে আমি একা লড়াই করছি। আমি যা বুঝেছি, সেটুকুই বোঝানোর চেষ্টা করছি মাত্র। এর বেশি আমি কিছু করছি বলে, আমার মনে হয় না।
ভক্ত:- কিন্তু আমার খুব মনে হয়। আমিও কিছু সেবামূলক কাজ করবার চেষ্টা করি। তাই এই বিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাই।
মহারাজ:- দেখুন সংস্কার বা শুদ্ধি নিজের থেকেই শুরু হয়, তবে এমন নয় যে আপনি আগে নিজে শুদ্ধ হবেন তারপর অন্যের সংস্কার কিংবা সমাজের সংস্কার করবেন।
আপনার নিজের শুদ্ধ হয়ে যাওয়াই প্রকৃত সমাজের সংস্কার।
এই কথাটার ব্যবহারিক প্রয়োগ কিরকম!
ধরুন, আপনার কাছে একটা আয়না আছে, তাতে অনেক ধুলো জমেছে। আপনি যখন সেই আয়নাটাকে পরিষ্কার করছেন, তখন তাতে যে রিফ্লেকশন পড়ছে তাকে কি আপনাকে আলাদা করে পরিষ্কার করতে হয়? আয়না পরিষ্কার হলে স্বাভাবিক ভাবে তার রিফ্লেকশনও পরিষ্কার হয়ে যায়।
আপনি যখন সমাজের সমস্যাগুলি গভীরে গিয়ে বুঝতে পারবেন, তখন আপনি জানবেন আপনার মধ্যেও স্বাভাবিকভাবে শুদ্ধি ঘটছে। কিন্তু কেউ যদি মনে করে যে কোনো নির্দিষ্ট কর্মকে সিলেক্ট করে নিলেই, তার মধ্য দিয়ে শুদ্ধি আপনা হতেই ঘটে যাবে তবে সব ক্ষেত্রে কিন্তু তা যথার্থ নাও হতে পারে।
আমাদের সমাজসেবা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কেমন হয়ে যায় জানেন?
অনেকটা এইরকম... যে ব্যক্তিটি পড়ে গেছে, এখন ওকে আমায় তুলতে হবে। কিন্তু এক্ষেত্রে আমরা যদি এই বিষয়ে সচেতন না থাকি যে ও আদৌ পড়ে যাচ্ছে! নাকি ও নিজে থেকেই পড়তে চাইছে! তবে ভুল হবার খুব সম্ভাবনা থেকে যায়..
ধরুন, কেউ সুইমিংপুলে ঝাঁপ দিতে যাচ্ছে, সে পড়ে যাচ্ছে মনে করে আপনি তাকে পিছন থেকে জাপ্টে ধরলেন। সে বলছে, 'আরে না না! আমি সাঁতার শিখতে চাই।' আর আপনি বলছেন 'না তোমায় আমি পড়তে দেবো না! আমি বইয়ে পড়েছি, কেউ পড়ে গেলে তাকে টেনে তুলতে হয়।'
তাহলে কি এটা যথার্থ কর্ম হবে?
(উপস্থিত সকলের হাস্য)
মহারাজ:- সঠিক কর্ম করতে গেলে সবার আগে নিজের নাশ চাই, নিজের আমিত্বের নাশ চাই।
নিজেকে ঘষতে থাকুন, নিজেকে ঘষতে ঘষতে যখন আপনার ব্যক্তিগত কিচ্ছু আর অবশিষ্ট থাকবে না, এমনকি আপনার জন্য আপনারও আর কোনো গুরুত্ব থাকবে না, তখন আপনি অন্যের জন্য নিজেকে ঢেলে দিতে পারবেন। তখনই একমাত্র জানবেন আপনার নাশ ঘটে গেছে।
যখন আপনার ব্যক্তিগত কোনো কিছুর জন্যই কিছু যায় আসে না, তখন জানবেন এবার সঠিক ভাবে আপনার সমাজের জন্য কর্ম করা শুরু হয়ে গেল..
সমাজসেবার মূল হল নিজের জন্য কিছুই রাখা যাবে না। এমনকি আমি যে কাজ করছি তার জন্য 'আমিই কর্তা', এমন কোন ভাবও আর অবশিষ্ট থাকবে না। যত যত আপনি নিজের সব কিছুকে, এমনকি নিজেকেও ছাড়তে পারবেন, তত তত আপনি সমাজসংস্কারক হতে থাকবেন।
এবার আপনাকে আর সমাজ সংস্কারক সাজতে হবে না। আপনার কাজই, আপনার জীবনই সমাজ সংস্কারের কারণ হয়ে যাবে।
"শ্রীরামকৃষ্ণ" শুধু নিজের জীবনটুকু বাঁচছিলেন মাত্র। কিন্তু তিনি আমাদের কাছে আদর্শ স্বরূপ হয়ে গেলেন। ঠাকুরকে বাইরে গিয়ে আলাদা করে বলতে হতো না যে, আমি শেখাতে এসেছি, তাঁর জীবনই আমাদের কিছু শিখিয়ে দিয়ে চলে গেল..
এরকম হয়ে যেতে হবে.. না হলে আপনি কোথাও না কোথাও গিয়ে ঠিক আটকে যাবেন।
এই জন্য একটা সহজ স্বীকারোক্তি চাই, যে ব্যক্তি হিসেবে আমি অতি নীচ, অতি হীন। তাই এই ব্যক্তিগত 'আমি'কে আমি আর এগিয়ে নিয়ে যাবো না।
এটা যখন ঘটে যায়, তখন আপনার জীবন আর আপনার থাকে না। তা বহুজনহিতায়, বহুজনসুখায় উৎসর্গিত হয়ে যায়।
এটাই হল প্রকৃত সমাজ সংস্কার।
পুনশ্চঃ পরবর্তী অংশ পরের ব্লগে সংযুক্ত হবে।